• নভেম্বর ২১, ২০১৯
  • Last Update নভেম্বর ২১, ২০১৯ ১:৩৫ অপরাহ্ণ
  • বাংলাদেশ

কুচক্রীরা সংখ্যালঘুকে না চিনেই নির্যাতনের শিকার অন্য জাতিগোষ্ঠী

কুচক্রীরা সংখ্যালঘুকে না চিনেই নির্যাতনের শিকার অন্য জাতিগোষ্ঠী

নজরুল ইসলাম তোফা:: প্রত্যেকটি গ্রাম এবং শহর এক অদৃশ্য দাগেই যেন ভাগ হয়েছে। তা হলো, হিন্দু আর মুসলিম। হিন্দুরা যেন মনে করছে মুসলমানের জন বিস্ফোরণ আছে, তাদের ইসলাম ধর্মেই রয়েছে গোঁড়ামি। আবার এই দেশের মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা মনে করছে, হিন্দু ধর্মালম্বীর মনোবৃত্তি খুব ভালো তা নয় তারাই এমন দেশটাকে ধ্বংস করবে। অন্যদিকে মুসলিমরা মনে করে সংখ্যা লঘুদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবেনা। হিন্দুদেরকে ছেড়ে কথা বলা যাবেনা। তাদের নিরাপত্তাকে বিঘ্ন ঘটিয়েই ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তারাতো সংখ্যালঘু। এমন এ পরিস্তিতি প্রায় এক দশক ধরেই যেন চলছে এ বাংলায় অর্থাৎ বাংলাদেশে।

কিন্তু হিন্দুদের দোষটা কোথায়? কেউ কেউ আবার বলে থাকে তারা ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়। তাইকি তারা নির্যাতিত হয়, তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ভাংচুর সহ দাঙ্গার পরে দাঙ্গা বাধে। চোখের বদলেই চোখ উপড়ে নেওয়া হয়। খুনের বদলে কি তারা খুন হয়। আমার জানা নেই, কিন্তু জানা আছে তাদেরকে “সংখ্যালঘু” বলা হয়। আসলেই কি তারা ‘সংখ্যালঘু’ না অন্য জাতি। জানা দরকার, এই আলোচনার মুল বিষয়টি হচ্ছে সংখ্যালঘু।  আন্তর্জাতিক আলোচনায় সর্ব সম্মতভাবেই সংখ্যালঘু কারা তার সংজ্ঞা সঠিক ভাবে আজও মিলেনি, তবুও জাতি সংঘের সাধারণ অধিবেশনের সর্ব বৃহৎ এক আলোচনায় অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৪৭/১৩৫ সিদ্ধান্ত মোতাবেক গৃহীত হয় জাতি সংঘে, সংখ্যালঘু ঘোষণা পত্রের ধারা ১ অনুযায়ী জাতিগত ভাবেই যেন নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের সংখ্যা লঘু হিসেবে ধরা হয়েছে।

এই সংখ্যা লঘুদের প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধ বা তাদের মানবাধিকার সুরক্ষা সংক্রান্তের জন্য জাতি সংঘের সাবকমিশনের একটি বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কো ক্যাপোটোর্টি ১৯৭৭ সালেই সংখ্যালঘুর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিল- সংখ্যালঘু বলতে সেই সম্প্রদায়কেই বুঝায় যারা সংখ্যাতাত্বিক দিক দিয়েই একটি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র জনসংখ্যা, আর নাকি ন্যূনতম আধিপত্য এবং অবস্থানও আছে, আর যারাই জাতিগত ভাবে এমন একটি নৃতাত্বিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যা বৃহৎ জনসাধারণের কাছেই পার্থক্য নির্দেশ করে। সারা বিশ্বের সকল দেশে জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত এমন এই “সংখ্যালঘু” সম্প্রদায়ের বসবাসের মাধ্যমেই সমাজকে নান্দনিক বৈচিত্র্যময়ও করেছে। এ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিচিত্র পরিস্থিতিতে বসবাস করলেও তারা সাধারণ ভাবেই প্রায়শ বহুবিধ বৈষম্যের শিকার বা তারা নির্যাতনের কবলে পড়ছে। তাদেরকে ‘প্রান্তিক অবস্থান’ থেকেও একবারে সমাজের বাহিরে ঠেলে দিচ্ছে।

লিখতে বা পড়তে কম জানা জাতিরা সীমাহীন নির্যাতন কিংবা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। তারা নিজ দেশেও বাস করে অনাহূত পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছে। অথচ এরাই সারাবিশ্বের মানব পরিবারের অংশীদার এবং তারা নিজ নিজ দেশ গঠনে, দেশের উন্নয়নে কিংবা সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিকাশে তাদের বহু অবদান আছে। বাংলাদেশেও এই জনগণ স্বাধীনতা যুদ্ধে ও দেশ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা ও কার্যক্রম রেখেছে। কিন্তু বহু পরিসংখ্যানে আবার উঠে এসেছে তাহলো সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায়, অবিচার, নিপীড়ন, উৎপীড়ন কিংবা নানান প্রকার অমানবিক অত্যাচারেই তাদের অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থাতেই এমন সংখ্যালঘু জনগণকে সংহতি বা তাদের অধিকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা ‘সকল জাতির’ কাম্য হওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু তা না করে এমন এই সংখ্যালঘুর পাশা পাশি হিন্দুদেরকে সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলছে।হিন্দুসম্প্রদায়ের লোকদের উদ্দেশ্য করেই যেন গুনী ব্যক্তিরা বলেছে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটিতে কষ্ট পাবেন না তা ভুলে যান। যে দেশে আমরা-আপনারা জন্মগ্রহণ করছি। যে দেশের আলো-বাতাস গ্রহণ করে আমরা বড় হয়েছি। সে দেশেই সংখ্যালঘু এবং সংখ্যা গরিষ্ট কি? জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। সুতরাং সংখ্যা লঘু নয়। কারণ আমাদের হীনমন্যতা সামনে চলার পথকে কিংবা বাংলাদেশের উন্নয়কেই বাধাগ্রস্থ করে। খুব পরিকল্পিতভাবে সংংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন হচ্ছে। তারাতো সংখ্যালঘুই চিনে না। আসলে জাতিসংঘের মৌলিক নীতিটা হচ্ছে: জাতি, বর্ণ, ভাষা-লিঙ্গ লঘুত্বের কারণে কারোর প্রতি বৈষম্য মুলক আচরণ কখনোই করা যাবে না। তাই বলতেই হয় এমন মানবাধিকারের মূল স্তম্ভ এবং সংখ্যালঘুর আইনগত সুরক্ষার মূলমন্ত্র বৈষম্যহীনতা বা সমতার নীতি, যা কিনা সকল সংখ্যা লঘু জাতির জন্যই যেন আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে সবাই একমত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক চুক্তি জাতি, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা এবং জাতি নির্বিশেষে সবার জন্যে মানবাধিকার বা স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান সহ বৈষম্যকেও নিষিদ্ধ করা আছে। এই বৈষম্য হীনতা কিংবা সমতার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমেই সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহনে কার্যকর অংশগ্রহণসহ সকল মানবাধিকার নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৭ ধারা এবং আন্তর্জাতিক শিশুসনদের ৩০ ধারায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষার কথাও বলা হয়েছে। তবে আবার জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ক- “জাতিসংঘের ঘোষণা পত্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংক্রান্ত কিছু মানদন্ড নির্ণয় করেছে। যা সংশিষ্ট রাষ্ট্রকেই যেন সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং পদক্ষেপ গ্রহনের ‘গাইডলাইন প্রদান’ করেছে।

সর্বোপরি ‘আন্তর্জাতিক চুক্তি সমূহের অধীনে’ প্রদত্ত রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি বা সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা এবং প্রতিনিধি জাতিসংঘের মানবাধিকার মনিটরিং দল এই কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে তাদের অধিকার বা সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বা তারা সমাজের অন্য বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর মতোই যেন জীবন যাপন করতে পারে এমন কথাটিও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। জানা দরকার আসলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু কারা। বাংলাদেশে কমপক্ষে ৪৫ টি সংখ্যা লঘু জাতিসত্তার দুটি পৃথক ভৌগলক পরিবেশেই তাদের বসবাস। এ দুটি ভৌগলক পরিবেশের মধ্যে একটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি), আর একটি উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সমূহ। এদের মধ্যেই মধুপুরের গড়াঞ্চল বিশেষ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। এ দেশের সংখ্যালঘুরাই হচ্ছে:- গারো, খিয়াং, ম্রো, বন, চাকমা, চাক, পাংখু, লুসাই, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন, তঞ্চঙ্গা, খাশিয়া, মণি পুরি, সাঁওতাল, রুজুয়াড়, মন্ডা পাহাড়িয়া, আসাম(অহমিয়া), মুসহর, সমাহাসী, সিং, বেদিয়া, মুরিয়ার, কর্মকার, মাহাতো, উঁরাও, খারিয়া, পাহান, কোচ, কাজবশী, হাজং, ডালু, ক্ষত্রিয়, গোর্সা, কন্দিকোল, চমনি, তুরি, পাত্র, রাই, মালো, ঘুনী, খন্ড, বানই, রাজবংশী। এই গুলোই এ দেশের ‘সংখ্যালখু’ জাতি, তাদের বহু দিনের দাবি তাহচ্ছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি। তাদের সঠিক জীবন যাপনের অধিকারও এই ‘বাংলার জমিনে’ প্রয়োজন রয়েছে।

ভূমি কিংবা অরন্যের উপর অধিকার। নিজস্ব সম্পদ অর্থাৎ ধন সম্পদের উপর অধিকার। কিন্তু তারা আজঅবধিও তা হাসিল করতে পারছে না। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে তাদের সহিত হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান জাতিগোষ্ঠীরও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এদেশের ধর্মীয় বেড়াজাল ও জাতিগতভাবে তাদের সংখ্যালঘু মনে করেই যেন নির্যাতিত হচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে নির্যাতন বন্ধসহ অন্যান্য অমানবিক নিষ্ঠুরতা এবং মর্যাদাহানিকর আচরণ ও শাস্তির বিরূদ্ধেই ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের এক আলোচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেই তা কার্যকর করে। কিন্তু এমন বাংলাদেশে তা কার্যকর হলে ‘সংখ্যালঘু’ মনে করে তাদের উপর নির্যাতন করবার খুব একটা সাহস পেতোনা। সর্বশেষ কথা হলো মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ফেলে যদি সংখ্যা লঘুদেরকে নিয়েই উন্নয়নের ভাবনার সৃষ্টি হয় বা তার প্রয়োগের মাধ্যমেই দেশীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভুক্ত ব্যক্তিদের নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে অন্তর্ভূক্তি করে এবং কার্যকর অংশ গ্রহনের মাধ্যমে তাদের নির্যাতন করা থেকে বেড়িয়ে এসে মুক্ত চিন্তা করতে পারলেই যেন বাংলাদেশের জনগণ একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবাধিকার ভিত্তিক উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারবে বা দেখাতে পারে।

লেখক:

নজরুল ইসলাম তোফা,

টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা,

চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *